নিজস্ব প্রতিবেদক::
বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের যে রূপরেখা সরকার নিয়েছে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গেও তার মৌলিক লক্ষ্যগুলোর মিল রয়েছে। সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের পরামর্শের মধ্যে সমন্বয় থাকলে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নেওয়ার একটি রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত রূপরেখা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলেও এর প্রতিফলন রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে এই রূপরেখার বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে।
সংস্কারে সরকারের নিজস্ব মালিকানা
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, জিডিপির তুলনায় কর আদায় বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়ানো এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসবই জনগণের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষায়, দেশীয় সংস্কার পরিকল্পনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর নীতিগত সমঝোতা রয়েছে। সংস্কারের লক্ষ্য ও অভীষ্টের মধ্যেও মিল রয়েছে। তবে এসব সংস্কারের মূল দায়িত্ব ও মালিকানা সরকারেরই থাকবে।
জ্বালানি ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে বলে জানান তিতুমীর। তার দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির পর জ্বালানি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করেনি।
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে পরিবার কার্ডের মতো কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমানো সম্ভব হতে পারে।
জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়কার অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার দায় এখন সাধারণ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা না ফিরলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে রাজস্ব আহরণ কমেছে। এতে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
বন্ধ শিল্প চালুতে অর্থায়ন
বন্ধ কলকারখানা চালু ও নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিতুমীর। এ ক্ষেত্রে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ অর্থায়নের বিস্তারিত শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি জানাননি।
তিনি বলেন, একদিকে শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের অনেক কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও অগ্রগতির কথা জানান তিতুমীর। থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাত তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।
কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। দেশে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের উৎপাদন বেশি হলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
দুই দেশের মধ্যে উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও জানান তিতুমীর। এতে কোনো পণ্যের কাঁচামাল বাংলাদেশে উৎপাদন, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি এবং চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও সম্ভব বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম-রেনং নৌ যোগাযোগে গুরুত্ব
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। দুই বন্দরের সংযোগ আরও কার্যকর করা গেলে পণ্য পরিবহন সহজ হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগে বাড়ছে আগ্রহ
সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিতুমীর। তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশ সফর করেছে।
এ ছাড়া সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগের কথা জানান তিনি।
তার দাবি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে সমন্বিত করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কাজ এগিয়ে নিতে চায় সরকার।
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ছে বলেও জানান তিনি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতোমধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর।
তিনি বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে সরকার।





