তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সবুজ নগর গড়ছে নিউইয়র্ক, ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০% বৃক্ষআচ্ছাদনের লক্ষ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক::

 

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যস্ত নগরী নিউইয়র্ক। আকাশচুম্বী ভবন, ঘনবসতি এবং যানজটের জন্য পরিচিত এই শহর এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বড় পরিসরে সবুজায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহের ঝুঁকি কমাতে ২০৪০ সালের মধ্যে শহরের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় বৃক্ষআচ্ছাদন গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নগর কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য নয়; জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নগরজীবনের মানোন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল শহর গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারও অংশ।

 

আট বছরে ১০ লাখ গাছ

সবুজায়নের এই যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে ‘মিলিয়ন ট্রিজ এনওয়াইসি’ কর্মসূচির মাধ্যমে। এর লক্ষ্য ছিল নিউইয়র্ক সিটির পাঁচটি বরোজুড়ে ১০ লাখ গাছ রোপণ করা।

কর্মসূচির আওতায় পার্ক, সড়কের পাশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসন, হাসপাতাল, উপাসনালয় এবং বিভিন্ন সরকারি খালি জায়গায় গাছ লাগানো হয়। এতে সিটি প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবেশবাদী সংগঠন, স্থানীয় কমিউনিটি এবং হাজারো স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেন।

নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০১৫ সালে ১০ লাখতম গাছ রোপণের লক্ষ্য অর্জিত হয়।

 

গাছ কেন গুরুত্বপূর্ণ

নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষের মতে, গাছ শুধু শহরের সৌন্দর্য বাড়ায় না; এটি নগর অবকাঠামোরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বড় গাছের ছায়া সড়ক ও ফুটপাতে সরাসরি সূর্যের তাপ কমায়, ফলে পিচ ও কংক্রিট অতিরিক্ত গরম হয় না। একই সঙ্গে গাছের পাতার মাধ্যমে জলীয় বাষ্প নিঃসরণের (ট্রান্সপিরেশন) ফলে আশপাশের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই শীতল থাকে।

 

তাপপ্রবণ এলাকাকে অগ্রাধিকার

নিউইয়র্কের সব এলাকায় সমানভাবে তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়ে না। যেসব এলাকায় গাছ কম এবং কংক্রিটের বিস্তার বেশি, সেখানে তাপমাত্রাও তুলনামূলক বেশি থাকে।

এ কারণে নতুন পরিকল্পনায় তাপপ্রবণ ও কম বৃক্ষআচ্ছাদিত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের আশা, ছায়া বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন বাতাস এবং উন্মুক্ত সবুজ এলাকা বাড়লে গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

 

পরিবেশের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুফল

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিণত গাছ বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে সহায়তা করে, ফলে জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টির চাপ কমে। এছাড়া গাছ বাতাসের দূষণ কমায়, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

নিউইয়র্ক সিটির কম্পট্রোলার মার্ক লেভিনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শহরের নগর বনাঞ্চল প্রতিবছর প্রায় ১২ কোটি মার্কিন ডলারের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে। পরিচ্ছন্ন বায়ু, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য পরিবেশগত সেবার মাধ্যমে এই সুফল পাওয়া যাচ্ছে।

 

শুধু রোপণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা

নগর কর্তৃপক্ষের মতে, গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ হয় না। নতুন গাছের নিয়মিত পরিচর্যা, পানি দেওয়া, ছাঁটাই এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ যেমন জরুরি, তেমনি পুরোনো গাছগুলোর নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ কাজে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচির মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মানচিত্রের মাধ্যমে শহরের প্রতিটি রাস্তার গাছের তথ্য সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এককালীন বৃক্ষরোপণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাই ভবিষ্যতের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নগর বন গড়ে তুলতে পারে।