এআই বিনিয়োগ, সরকারি ঋণ ও সাইবার হামলা: বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকির সতর্কতা আইএমএফের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক::

 

বিশ্বের আর্থিক বাজারে আপাতত স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও এর আড়ালে বাড়ছে নানা ধরনের ঝুঁকি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়া, মূল্যস্ফীতির চাপ, সরকারি ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাইবার হামলার বিস্তার ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে বড় সংকটের মুখে ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্যসংকট যুক্ত হলে বাজারের সাময়িক অস্থিরতা আরও বড় আর্থিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী থাকা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো মুনাফার কারণে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার এখনো স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। তবে আর্থিক খাতের ঝুঁকি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন খাতে জমে থাকা দুর্বলতা ভবিষ্যতে বড় কোনো সংকটের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তিনটি ঝুঁকির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—এআই খাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি আর্থিক পরিস্থিতির কারণে বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তার হুমকি।

এআই খাতে প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। তবে এ খাত থেকে প্রত্যাশিত আয় ও মুনাফা না এলে কিংবা বর্তমান প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী না হলে এআই-সংশ্লিষ্ট সম্পদের বাজারমূল্যে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের সঙ্গে ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট কিছু সম্পদে বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সম্পদের দাম কমে গেলে তার প্রভাব শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বৃহত্তর বিনিয়োগ বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণে বাড়তে পারে চাপ

মূল্যস্ফীতি নতুন করে বেড়ে গেলে কিংবা সরকারের ঋণ ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে সরকারি বন্ডের সুদের হার দ্রুত বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায়।

বন্ডের সুদের হার বাড়লে আগে ইস্যু করা বন্ডের বাজারমূল্য সাধারণত কমে যায়। পাশাপাশি ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

এর ফলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়া, ঋণ পরিশোধে চাপ বৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিমা ও পেনশন তহবিলে তারল্যসংকটের শঙ্কা

বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে সহনশীল অবস্থায় থাকলেও কিছু ব্যাংকের দুর্বলতা এখনো উদ্বেগের কারণ। একই সঙ্গে বিমা কোম্পানি ও পেনশন তহবিলগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারল্যসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনের সময় নগদ অর্থ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বাজারে অস্থিরতা বাড়লে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদা মেটাতে সম্পদ বিক্রি করতে হতে পারে। এতে সম্পদের দাম আরও কমে যাওয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া বেসরকারি ঋণবাজারে ঋণনির্ভর বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আকস্মিক নগদ অর্থের চাহিদা সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জও আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনে হেজ ফান্ডগুলোর ভূমিকাও তুলে ধরা হয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এসব তহবিল বাজারের লেনদেন সচল রাখতে সহায়তা করলেও অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ এবং একই ধরনের লেনদেনে অনেক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সংকটের সময় অস্থিরতা বাড়াতে পারে। এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট প্রধান ব্রোকার ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়তে পারে।

সাইবার হামলা আর্থিক স্থিতিশীলতার নতুন চ্যালেঞ্জ

আর্থিক খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তিগত সংযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। হামলার কৌশল আরও জটিল হওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নতুন ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তাকে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব একাধিক প্রতিষ্ঠান ও বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

উদীয়মান অর্থনীতি ও টোকেনভিত্তিক সম্পদেও ঝুঁকি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু উদীয়মান বাজারে অর্থনৈতিক ও আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার নীতিগত সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম উন্নত আর্থিক বাজারের কিছু অর্থনীতি কম স্বচ্ছ অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে ঋণ ও আর্থিক দায়ের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করা কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে, টোকেনভিত্তিক সম্পদের বাজার এখনো তুলনামূলক ছোট হলেও ভবিষ্যতে এসব সম্পদ আর্থিক লেনদেনের দক্ষতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর বিস্তারের সঙ্গে ঋণনির্ভরতা, তারল্য ও মেয়াদের অসামঞ্জস্য এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।

আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বচ্ছতা ও প্রস্তুতির তাগিদ

বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য সংকট থেকে সুরক্ষিত রাখতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ এবং আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে আর্থিক ব্যবস্থা ঝুঁকিমুক্ত। বরং বিভিন্ন খাতে জমে থাকা দুর্বলতা বড় কোনো ধাক্কার সময় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে।

এ কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা, কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ।