বাংলাদেশের প্রথম মনোরেল চালু হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামে : মেয়র শাহাদাত

 

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ::

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চট্টগ্রামে মনোরেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে আগামী বছরের মধ্যে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে আমি ইতিমধ্যে সড়ক ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি।

প্রকল্পটির প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহল অত্যন্ত আগ্রহী।

যদি আমরা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাই শেষ করতে পারি, তাহলে আগামী বছরের মধ্যে প্রকল্পটির মূল কাজ করা সম্ভব হবে। আর তাহলে বাংলাদেশের প্রথম মনোরেল চালু হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামে।

নগরের যানজট নিরসনে চট্টগ্রাম মহানগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থা ও মনোরেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নিয়ে শনিবার (৬ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রেস্ট হাউজে মতবিনিময় সভায় মেয়র এসব কথা বলেন। সভায় মেয়র শাহাদাত হোসেনের সাথে বৈঠক করেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর ৫ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

বৈঠকে ছিলেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মশিউর রহমান, অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (ম্যাস ট্রানজিট) ও যুগ্মসচিব আবদুল লতিফ খান, ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ফিজিবিলিটি স্টাডি অব আরবান মেট্রো রেল ট্রানজিট কনস্ট্রাকশন অব চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এরিয়া-সিএমএ প্রকল্প পরিচালক ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার মীর মোহাম্মদ কামরুল হাসান, ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার, সিএমএ প্রকল্প এবং ম্যাস ট্রানজিট প্ল্যানার মুহাম্মদ আবদুর রকিব এবং সহকারী ম্যাস ট্রানজিট ইঞ্জিনিয়ার (বিআরটি) মো. ইনজামুল হক মেহেদী।

সভায় চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ও গ্রেটার চিটাগাং ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সাদাত, নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ শাফকাত আমিন, আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়ামের প্রধান প্রতিনিধি কাউসার আলম চৌধুরী প্রকল্পের বিষয়ে বক্তব্য দেন।

মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দরনগরী, বাণিজ্যিক রাজধানী এবং অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যানজট এ নগরের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন কর্মঘণ্টার অপচয়, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং জনভোগান্তির কারণে নগরবাসীকে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। নগরবাসী দ্রুত, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে সড়কের ওপর চাপ কমে যাবে এবং যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। আমরা চাই পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট মহানগরীতে রূপান্তর করতে।

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ বিবেচনায় মনোরেল একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। আমরা আশা করছি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হলে আগামী বছরের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। চট্টগ্রামবাসীর বহুদিনের প্রত্যাশা পূরণে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন শুধু এই নগরের উন্নয়ন নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই নগরের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করছি। মনোরেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে যানজটমুক্ত, গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব নগরে পরিণত করা সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ডিটিসিএর কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, চট্টগ্রামের পরিবহন খাতের উন্নয়নে আপনাদের কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা একটি আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবো, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও উন্নত নগর উপহার দেবে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান জানান, ৫ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ডিটিসিএর ৫ সদস্যের এই টিম চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সরেজমিন পরিদর্শন করছেন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে সভা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে প্রকল্পের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করবেন।

আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামকে একটি স্মার্ট, আধুনিক ও টেকসই নগরে রূপান্তরের অংশ হিসেবে মনোরেল প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, পাহাড়-সমুদ্রবেষ্টিত অবস্থান, সীমিত সড়ক অবকাঠামো এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগর বিন্যাস বিবেচনায় এখানে মেট্রোরেলের তুলনায় মনোরেল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারে। মনোরেল নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম জায়গার প্রয়োজন হয় এবং বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থার ওপর কম প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত হয়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যানজট নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করছে। মনোরেল চালু হলে নগরবাসী দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াত সুবিধা পাবে, একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়বে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে।

বিশ্বের অনেক উন্নত শহরে মনোরেল সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি একটি পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। চট্টগ্রামেও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে নগরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে এ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে।